মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

যশোর জেলার স্মরণীয় ক’জন

 

১। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত

২। কর্মবীর মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ

৩।রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার (১৮৫৯-১৯৩২)

৪। জ্যোতিস্ক বিজ্ঞানী রাধাগোবিন্দ চন্দ (১৮৭৮-১৯৭৫)

৫। সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শিশির কুমার ঘোষ

৬। এ্যাডভোকেট শহীদ মশিউর রহমান

৭। যতীন্দ্রনাথ মূখোপাধ্যয় (বাঘা যতীন, ১৮৭৯-১৯১৫)

৮। প্রফেসর শরীফ হোসেন (১৯৩৬-২০০৭)

৯। সংগ্রামী মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন (১৯১৬-১৯৯৭)

১০। বেগম আয়েশা সরদার (নারী আন্দোলনের নেত্রী, ১৯২৭-১৯৮৮)

১১। শিক্ষাবিদ আব্দুর রউফ (১৯০২-১৯৭১)

১২। ওয়াহেদ আলী আনসারী

১৩। বিশিষ্ট সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ এ্যাডভোকেট রওশন আলী

১৪। কে পি বসু (কালিপদ বসু, ১৮৬৫-১৯১৪)

১৫। আলোকচিত্রকর মোঃ সফি

 

মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরেুল্লাহ (১৮৬১-১৯০৭)

 

 ভাব মন দমে দম, রাহা দূর বেলা কম
   ভুখ বেশী অতি কম খানা।
ছামনে দেখিতে পাই পানি তোর তরে নাই
  কিন্তু রে পিয়াসা ষোল আনা !
দেখিয়া পরের বাড়ী  জামা জোড়া ঘোড়া গাড়ি
  ঘড়ি ঘড়ি কত সাধ মনে,
ভুলেছ কালের তালি, ভুলেছ বাঁশের চালি,
  ভুলিয়াছ কবর সামনে।

পরিচিতি:
কবিতাটিতে মানবদেহের পরিণাম এবং সংসারের ধন-জন ও বংশ মর্যাদা কিভাবে কবরে বিলীন হয়ে যায়, কবি এই ভাবার্থটি প্রস্ফূটিত করে তুলেছেন।

এই কবিতাটির রচয়িতা-আধ্যাত্নিক চিন্তা চেতনার সাধক, বঙ্গের খ্যাতিমান বাগ্মী, সমাজসেবক, সমাজ সংস্কারক, সাহিত্যিক ও ধর্ম প্রচারক মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহর ১৮৬১ সালের ২৬ ডিসেম্বর জেলার ঝিনাইদহ মহাকুমার কালীগঞ্জ থানাধীন বার বাজারের নিকটবর্তী ঘোপ নামক গ্রামে নিজ মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছাতিয়ানতলা গ্রামে। এই গ্রামে তাঁর পূর্ব পুরুষরাই সর্বপ্রথম বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্‌শী মোহাম্মদ ওয়ারেস উদ্দীন।

শিক্ষাজীবন:
সংসারের নিদারুন দরিদ্রতা ও পিতার অকাল মৃত্যুর কারণে মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বিঘ্নিত হয়। এ সময় তিনি নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা সম্পন্ন করে দুর্দ্দমনীয় জ্ঞান তৃষ্ণার তাড়নায় গৃহত্যাগ করে কয়ালখালি গ্রাম নিবাসী মোঃ মোস্‌হাব উদ্দীনের নিকট তিন বৎসর এবং পরবর্তীতে করচিয়া নিবাসী মোহাম্মদ ইসমাইলের নিকট তিন বৎসর আরবী ও ফারসী ভাষা শিক্ষা করেন। বিশ্ব বরেণ্য কবি শেখ সাদীর পান্দেনামা, গুলিস্থা ও বুস্তা তাঁর জীবনের উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। তৎকালীন সময়ে উক্ত ২টি পুস্তকের ওপর জ্ঞান ও হৃদয়ঙ্গমতা কোন ব্যক্তির জ্ঞান ও শিক্ষার মাপ কাঠি বিবেচিত হত। তিনি বিভিন্ন সভায় তাঁর বক্তৃতার মধ্যে এই সমস্ত গ্রন্থ থেকে অতি মধুর সুরে ফরাসী বয়াত আবৃত্তি করে মর্মষ্পর্শী ভাষায় শ্রোতাকুলকে আপ্লুত করতেন।
উর্দু ভাষায় ও তাঁর ব্যাপক ব্যুৎপত্তি ছিল। বিভিন্ন উর্দু পুস্তক ও সাময়িক পত্র পত্রিকাদি তিনি নিয়মিত পড়াশোনা করতেন।
জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি জীবিকার অন্বেষণে তিনি খোজার হাটের এক দর্জির দোকানে সেলাইয়ের কাজ শেখা শুরু করেন। এ সময়ও তিনি মুন্‌শী তাজ মাহমুদের নিকট উর্দু ও ফারসী সাহিত্যের উপর জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন।
মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ দর্জি বিদ্যায় উন্নত শিক্ষা গ্রহণের জন্যে খড়কী গ্রামের ‘সাহেব বাড়ীর দর্জি’ জাহা বকস্ মীর্জার নিকট দর্জির কাজ শেখা আরম্ভ করেন। এখানে তিনি দীর্ঘ ৫/৬ বৎসর অবস্থান করে দর্জি পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। এই ভিন্নধর্মী কাজের মাঝেও তিনি জ্ঞান অর্জনে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। যশোর শহরের দড়াটানায়ও তিনি এক উন্নত মানের দর্জির দোকান চালু করেন।

ইসলাম ধর্মের প্রচারক:
১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার ভাগ্য বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে এদেশের মুসলমানদেরও ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে। বাংলাদেশের সমস্ত গ্রাম-গঞ্জ শহর বাজারের খ্রীস্টান পাদ্রীদের খ্রীস্টান ধর্ম প্রচারের প্রবল প্রচেষ্টা বৃদ্ধি পায়। পাদ্রীদের নানা কুহেলিকাপূর্ণ কূট তর্কজাল সমাচ্ছন্ন বক্তৃতা শুনতে শুনতে অল্প বয়স্ক সত্যানুসন্ধিৎসু মুন্‌সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ বিচলিত হয়ে পড়েন। এরূপ এক সংকটকালীন মুহূর্তে প্রসিদ্ধ বক্তা ও ইসলাম প্রচারক হাফেজ নিয়ামতুল্লাহ কর্তৃক লিখিত ‘খ্রীস্টান ধর্মের ভ্রষ্টতা’ নামক এবং প্রথম জীবনে খ্রীস্টান ধর্ম প্রচারক ও পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম প্রচারক পাদ্রী ঈশান চন্দ্র মন্ডল ওরফে মুন্‌শী মোহাম্মদ এহসানুল্লাহর ‘ইনজিলে হয়রত মোহাম্মদের খবর আছে’ গ্রন্থ দু’খানি অধ্যয়নের পর তিনি নতুন আলোর সন্ধান পান।
ইসলামের নতুন তেজে নতুন শক্তিতে পূর্ণ হয়ে দীপ্ত মিহিরের ন্যায় নিত্য পরিপূর্ণ ও প্রতিভাত হতে লাগলেন। মুসলিম বীর মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ পাদ্রীদের অনুকরণে হাটে মাঠে ঘাটে তাঁদের বক্তৃতার তীব্র প্রতিবাদ শুরু করলেন। হাটের একদিকে পাদ্রীদের বক্তৃতা অন্য প্রান্তে মুন্‌শীর বক্তৃতা। অতি অল্প সময়ে তরুণ মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহর ধর্ম প্রচারের ঘটনা গ্রামে, শহরে এবং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
মুন্‌শী সুদূর দার্জিলিং শহরেও দর্জির দোকান খুলেছিলেন এবং সেখানেও পাদ্রীদের একই অনাচার ও কার্যকলাপ দেখে তাঁর মন প্রাণ ব্যাকুল ও ব্যথিত হয়ে উঠলো। তিনি সেখানেও ধর্ম প্রচারের কাজ আরম্ভ করেন। ধর্ম-জ্ঞানে পরিপূর্ণতা লাভের জন্যে তিনি বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন শুরু করেন। মুন্‌শী মেহেরুল্লাহ মহীশুর থেকে প্রকাশিত ‘মনসুরে মোহাম্মদী’ এবং হয়রত সোলায়মান ওয়ার্সির লেখা কেন আমি আমার পৈত্রিক ধর্ম ত্যাগ করেছিলাম’, ‘কেন আমি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী হয়েছিলাম’ ও ‘প্রকৃত সত্য কোথায়’ গ্রন্থগুলি পাঠ করে ব্যাপক উৎসাহিত ও উপকৃত হয়েছিলেন।
মেহেরুল্লাহ দার্জিলিং থেকে যশোরে ফিরে এসে আবার যশোরের বিভিন্ন এলাকায় ধর্ম প্রচারের কাজে আত্ননিয়োগ করেন। এসময় তাঁর সহযোগী হিসেবে খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে ধর্ম প্রচারে অবতীর্ণ হতেন যশোরের ঘোপ এলাকার বাসিন্দা মুন্‌শী গোলাম রব্বানী ও ঘুরুলিয়ার মুন্‌শী মোহাম্মদ আব্দুল কাশেম।
মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ইসলাম ধর্ম প্রচারের এবং খ্রীস্টানদের মিথ্যা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে নিরস্ত্র জেহাদ ঘোষণা করেন এবং জেহাদকে সার্থক ও সফল করার লক্ষ্যে তিনি কলকাতার মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতা মুন্‌শী রিয়াজ উদ্দিন আহাম্মদ ও মুন্‌শী আব্দুর রহিম প্রমুখ ধর্মপ্রাণ, মুসলিম হিতৈষী নেতাদের সাথে আলোচনা করেন। মুসলিম সমপ্রদায়ের কল্যাণ ও খ্রীস্টান পাদ্রিদের অপপ্রচারের হাত থেকে ইসলাম ধর্ম তথা মুসলিম সমাজকে রক্ষা করার অভিপ্রায়ে কলকাতার ‘না-খোদা’ মসজিদে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় নিখিল ভারত ইসলাম প্রচার সমিতি নামে এক সমিতি গঠন করা হয়। এই সমিতি কর্তৃক বাংলা ও আসামে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্যে মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তিনি বঙ্গ ও আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্দীপ্তময় যুক্তিপূর্ণ বক্তৃতার মাধ্যমে মুসলমানদের ভাঙ্গা বুক আবার সতেজ করে তোলেন।
খ্রীস্টান ধর্ম প্রচার মিশনের অন্যতম কর্তা রেভাঃ জন জমিরুদ্দিন ইসলাম ধর্ম প্রচারে এক সময় মুন্‌শী মেহেরুল্লাহর সঙ্গী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মুন্‌শী মেহেরুল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইসলাম ধর্মের ব্যাপক বিরোধিতা করেন।

সাহিত্য কর্ম:
১৮৯২ সালে জুন মাসে ‘খ্রীস্টীয় বান্ধব’ নামক মাসিক পত্রিকায় জন জমিরুদ্দিন ‘আসল কোরান কোথায়’ শীর্ষক এক বিভ্রান্তিমূলক প্রবন্ধ লেখেন। এই বিভ্রান্তিকর প্রবন্ধের জবাবে মুন্‌শী মেহেরুল্লাহ তৎকালীন প্রচলিত বিখ্যাত সাপ্তাহিক ‘সুধাকর’ পত্রিকায় (১৮৯২ সালের জুন মাসের ২০ ও ২৭ তারিখে) ‘ঈসায়ী বা খ্রীস্টানী ধোকা ভঞ্জন’ নামক সুদীর্ঘ গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করে জন জমিরুদ্দিন কর্তৃক লিখিত ছয়টি প্রশ্নের যুক্তিপূর্ণ উত্তর প্রদান করেন। মেহেরুল্লাহর প্রবন্ধের উত্তরে জমিরুদ্দিন ‘সুধাকর’ পত্রিকাতেই ক্ষুদ্র আরেকটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এর উত্তরে মুন্‌শী মেহেরুল্লাহ ‘আসল কোরান সর্বত্র’ নামক আর একটি দীর্ঘ ও তথ্য যুক্তিপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।
জন জমিরুদ্দিন প্রবন্ধটি পড়ে নীরব হয়ে পড়েন। মুন্‌শী মেহেরুল্লাহর সহযোগী হবার আশা ব্যক্ত করে খ্রীস্টান হতে পুনরায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে জন জমিরুদ্দিন হতে শেখ মুন্‌শী জমিরুদ্দিন নাম ধারণ করেন।
খ্যাতিমান ইসলাম প্রচারক মুন্‌শী মেহেরুল্লাহর ধর্ম প্রচারের ইতিহাসে এটি এক বিষ্কয়কর ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা। জমিরুদ্দিন কর্তৃক লিখিত ‘মেহের চরিত’ নামক গ্রন্থে তিনি মুন্‌শী মেহেরুল্লাহর ধর্ম প্রচার সম্পর্কে উচ্ছ্বাসিত প্রশংসা  করেছেন।
মুসলিম জাতির উন্নয়নে সাহিত্য ও সংবাদ পত্রের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির জন্যে অক্লান্ত প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন।
এ উদ্দ্যেশে তিনি চব্বিশ পরগণা নিবাসী শেখ আব্দুল রহিমের সাথে যোগাযোগ করেন। তখনকার দিনে মুন্‌শী আবদুর রহিমের সম্পাদনায় ও মুন্‌শী শেখ রিয়াজউদ্দীনের প্রকাশনায় কলকাতা থেকে মুসলিম ঐতিহ্যবাহী ‘সুধাকার’ পত্রিকাটি প্রকাশিত হত। ‘মিহির’ ও ‘সুধাকার’ পত্রিকা দুটির উন্নতি ও প্রচারের জন্যে মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহর বিশেষভাবে প্রচেষ্টা চালান। ‘মিহির’ ও ‘সুধাকার’ নামক মাসিক পত্রিকারও তিনি পৃষ্ঠপোষকতা ও এই পত্রিকাগুলির নিয়মিত লেখক ছিলেন।
বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্যে ও জাতীয়তা গঠনের মূলে এই মনীষীসহ শেখ ফজলুল করিম সাহিত্য বিশারদ, মৌলভী রেয়াজুদ্দিন আহাম্মদ, কবি মোজাম্মেল হক ও সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী’র নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।
১৮৮৬ খৃঃ মুন্‌শী মেহেরুল্লাহ প্রথম প্রকাশিত বই ‘খ্রীস্ট ধর্মের অসারতা’ প্রকাশিত হয়। এই বইটি খ্রীস্টান ধর্ম প্রচারকদের কার্যকলাপ সম্পর্কে ও খ্রীস্টান ধর্মগ্রন্থ বাইবেল সম্পের্কে সমালোচনা করে লেখা।
তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘মেহেরুল এসলাম’। গ্রন্থখানির ভাষা অত্যন্ত সহজ সরল, সাধারণ পাঠকের বোঝার উপযোগ্য। গ্রন্থটি পুঁথি আকারে লিখিত। এই গ্রন্থে একেশ্বরবাদের মাহাত্ন্য প্রচারিত হয়েছে।
বিখ্যাত পারস্য কবি শেখ সাদির পান্দেনামা পুস্তকটি অনুবাদ করে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ লিখিত ‘রদ্দে খ্রীস্টান’ এবং ‘খ্রীস্টান ধর্মের অসারতা’ নামক পুস্তক দু’খানি তাঁর বক্তৃতা অপেক্ষা অনেক কার্য উপযোগী। এই পুস্তক দু’খানি যেন সারা দেশ ব্যাপি খ্রীস্টান পাদ্রীদের মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ‘রদ্দে খ্রীস্টান’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ড ‘দলিলুল ইসলাম’ প্রকাশের পূর্বেই মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ইন্তেকাল করেন।
মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহর রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা আর্জন করেছিল ‘বিধায় গঞ্জনা’ ও ‘হিন্দু ধর্ম রহস্য’। হিন্দু বিধবাদের জীবনের করুণ চিত্র মর্মষ্পর্শী ভাষায় সমালোচনাকারে গদ্য ও পদ্যের মিশ্রণে ‘বিধবা গঞ্জনা’ গ্রন্থটি মুন্‌শী মেহেরুল্লাহর এক অপূর্ব সাহিত্য সৃষ্টি।
“দেবলীলা বা হিন্দু ধর্ম রহস্য’ নামক গ্রন্থটিতে পৌরাণিক দেবদেবীগণের লীলা খেলার কাহিনী নিয়ে রচিত। গ্রন্থটির ভিত্তি হচ্ছে হিন্দু ধর্মশাস্ত্র। গ্রন্থ দু’খানিতে হিন্দু সমাজের সংকীর্ণতা ও বিধবাদের মনঃপীড়ার করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
মুন্‌শী মেহেরুল্লাহর মৃত্যুর পর কতিপয় স্বার্থান্বেষী হিন্দু সমাজপতির প্রচেষ্টায় ইংরেজ সরকার উক্ত পুস্তক দু’খানি বাজেয়াপ্ত করে এবং প্রকাশকের বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

বঙ্গেরখ্যাতিমান বাগ্মী, সমাজ সংস্কারক, সাহিত্যিক ও ধর্ম প্রচারক মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ-এর পৈত্রিক বাড়ী যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলাগ্রামে। তিনি পান্দানামা নামক সেখ সাদির সুবিখ্যাত কাব্যের অনুবাদ সহ ‍”রদ্দে খৃষ্টান”ও “দলিদোল ইসলাম”নামক দুখানি গ্রন্থ রচনা করেন। মেহেরু্ল্লাহ’র রচনাবলীর মুল উদ্দেশ্য ধর্ম বিষয়ক তর্কে ইসলামের মহত্ব প্রতিষ্ঠা করা। খৃষ্টান ধর্ম প্রচারকদের তীব্র সমালোচনার যৌক্তিক জবাব উপস্থাপন করে সাধারণ মানুষকে ধমান্তরের হাত থেকে রক্ষা করেন।

পরলোকগমন:
বঙ্গের অদ্বিতীয় বাগ্মী, ইসলাম ধর্ম প্রচারক মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ ১৯০৭ সালের ৭ জুন শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় পরলোকগমন করেন।
মুন্সি মেহেরুল্লাহ স্মরণে :

 

  
এই কর্মবীর মুন্সি মেহেরুল্লাহর মুত্যুর পর তাঁর নিজ গ্রাম ছাতিয়ানতলায় তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি স্টেশন প্রতিষ্ঠা করে তার নামকরণ করা হয় ‘মেহেরুল্লাহনগর স্টেশন’।
অসাধারণ বাগ্নী, সমাজসংস্কারক, ইসলাম প্রচারক মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ এর ১৯৯৫ সালের ৭ জুন ৮৭ তম মৃত্যু বার্ষিকীতে  মুন্‌শী মেহেরুল্লাহ এর ছবিসহ ডাকটিকিট ও স্মারক খাম ডাক বিভাগ প্রকাশ করেন।
১৯০১ সালে মুন্‌শী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ কর্তৃক যশোরের মনোহরপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় মাদ্রাসায়ে কেরামতিয়া। পরবর্তীতে তাঁর প্রচেষ্টায় মাদ্রাসাটি এম. ই স্কুলে রূপান্তরিত হয়ে আজকের পর্যায়ে উন্নীত হয়। এলাকাবাসী ও কাজী নজরুল ইসলাম কলেজের উপাধ্যক্ষ মশিউল আযমের প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টি এই কর্মবীরের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নামকরণ করা হয় মুন্‌শী মেহেরুল্লাহ একাডেমী। পরে তাদের প্রচেষ্টায় মুন্‌শী মেহেরুল্লাহ সমাজকল্যাণ সংস্থা ও মুন্‌শী মেহেরুল্লাহ ফাউন্ডেশন গড়ে উঠে।

 

 

ক্রমিক

বিখ্যাত ব্যক্তির নাম

জন্মস্থান ও জন্ম সন

মৃত্যুর সন

উল্লেখ্যযোগ্য কার্যাবলী / অর্জন

 

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত

যশোর জেলার কেশবপুর থানার সাগরদাঁড়ী গ্রামে ১৮২৪ খ্রিঃ ২৫ জানুয়ারী জন্মগ্রহণ করেন।

১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলিকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

মহাকবি বাংলা সাহিত্যের অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক, আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম স্রষ্ঠা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কালজয়ী রচনাবলীর অন্যতম হলো- মেঘনাদবধ কাব্য, Captive Lady,শর্মিষ্ঠা, কৃষ্ণকুমারী, বুড়ো শালিকের ঘাঁড়ে রোঁ, তিলোত্তমা সম্ভব, বীরাঙ্গণা ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

কর্মবীর মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ

 

১৮৬১ সালে ২৬ডিসেম্বর তৎকালীন যশোর জেলার বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জেরঘোপনামক স্থানে জন্ম গ্রহণ করেন।

১৯০৭ সালে ৭ জুন পরলোক গমন করেন।

বঙ্গেরখ্যাতিমান বাগ্মী, সমাজ সংস্কারক, সাহিত্যিক ও ধর্ম প্রচারক মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ-এর পৈত্রিক বাড়ী যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলাগ্রামে। তিনি পান্দানামা নামক সেখ সাদির সুবিখ্যাত কাব্যের অনুবাদ সহ ‍”রদ্দে খৃষ্টান”ও “দলিদোল ইসলাম”নামক দুখানি গ্রন্থ রচনা করেন। মেহেরু্ল্লাহ’র রচনাবলীর মুল উদ্দেশ্য ধর্ম বিষয়ক তর্কে ইসলামের মহত্ব প্রতিষ্ঠা করা। খৃষ্টান ধর্ম প্রচারকদের তীব্র সমালোচনার যৌক্তিক জবাব উপস্থাপন করে সাধারণ মানুষকে ধমান্তরের হাত থেকে রক্ষা করেন।

রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার

১৮৫৯সালে বৃহত্তর যশোর জেলার লোহাগড়া গ্রামে এক সম্ভান্ত বংশে জন্মগ্রহণকরেন।

১৯৩২মৃত্যু বরণ করেন।

যশোরের সিংহ পুরুষ রায়বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার। ইংরেজী শিক্ষার পাশাপাশি ক’জন পন্ডিত নিজ বাড়ীতে চতুস্পাটি খুলে সংস্কৃত শিক্ষা চালু রাখেন। তিনি বাংলা, ইংরেজী ছাড়াও সংস্কৃত ভাষায় সুপন্ডিত ছিলেন। প্রখ্যাত আইনজীবী রায়বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার আইনগত পদ্ধতিতে নীলকরদের হাত থেকে এদেশবাসীকে বাঁচিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। যশোর সম্মিলনী ইন্সটিটিউট (১৮৮৯), যশোর টাউন হল (বর্তমান আলমগীর সিদ্দিকী হল) কল্যাণী প্রেস (১৮৯৯) সহ অনেক সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে জনপদের সার্বিক উন্নতিতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন।

 

 

জ্যোতিস্ক বিজ্ঞানী রাধাগোবিন্দ চন্দ

১৮৭৮সালের ১৬ জুলাই যশোর জেলার বাগচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৭৫ সালের ৩ এপ্রিল বারাসাতের দূর্গাপল্লীতে মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি ছিলেন যশোর কালেক্টরেট অফিসের একজন সামান্য কেরানী। ১৯১০ সালে হ্যালির ধুমকেতৃ পর্যবেক্ষণ করলেন অনেকদিন। অভ্যাসমত একটি খাতায় তিনি তার পর্যবেক্ষণ লিখে রাখতেন। পরে এই নিয়ে লিখলেন একাধিক প্রবন্ধ। দিনভর চাকুরী আর রাত হলেই ধৈর্য্য ধরে আকাশ পর্যবেক্ষণ। রাতের পর রাত অসীম ধৈর্য্যের সংগে পরিশ্রম করে তিনি গড়ে তুললেন এক অমূল্য তথ্য ভান্ডার। রাধাগোবিন্দের সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করতো সেই কালের ইউরোপ আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মানমন্দির, আমেরিকান এ্যাসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টার অবজার্বার, লন্ডনের ব্রিটিশ অ্যাষ্টোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ফ্রান্সের লিয় মানমন্দির প্রভৃতি। রাধাগোবিন্দের পর্যবেক্ষণ লব্ধ তথ্য প্রকাশ পেতো এসব মানমন্দির প্রকাশিত পত্র-পত্রিকায়। হার্ভার্ডে এখনও তার পর্যবেক্ষণ লব্ধ তথা সযত্নে রক্ষিত আছে। হার্ভার্ড মানমন্দির কর্তৃপক্ষ ১৯২৬ সালে সেই সূদর আমেরিকা থেকে যশোরের ঐ পাড়াগায়ে ছ’ইঞ্চি ব্যাসের একটি দূরবীণ পাঠিয়ে দেন এবং সাথে মানমন্দিরের ডিরেক্টরের কৃতজ্ঞতাপত্র। ফরাসি সরকার পরিবর্তনশীল নক্ষত্র সম্পর্কে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯২৮ সালে রাধাগোবিন্দ OARF (Officer of Academic Republiance frencaise)সম্মানসূচক উপাধি ও পদক প্রদান করেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর রাধাগোবিন্দ কলকাতা চলে যান।

সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শিশির কুমার ঘোষ

১৮৪০ সালে যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানার পলুয়া মাগুরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

 

সিংহ পুরুষ শ্রী ঘোষ ঊনবিংশ শতকে যশোরে একটি পরিচিত নাম। নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং জনগণকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে আপোষহীন সংগ্রাম করে যিনি যশোস্বী হয়ে আছেন। মায়ের যোগ্য সন্তান হিসেবে মায়ের নামে ঝিকরগাছায় বাজার প্রতিষ্ঠা করেন এবং পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি ১৮৫৭ সালে এন্ট্রান্স পাশ করেন। ভর্তি হন সেকালের সেরা বিদ্যাপীঠ কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। লেখাপড়া শেষ না করেই জন্মস্থানের টানে যশোর ফিরে আসেন এবং জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন। সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজে জনগণের সার্বিক অবস্থা ও ইংরেজদের অত্যাচার নির্ভয়ে তুলে ধরতেন। সংবাদ পত্রের অনন্য পথিকৃৎ সুসাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এ মনীষী Lord Gouranga, Salvation for Allবাজারের লড়াই ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তাছাড়া বাংলা ও ইংরেজীতে বেশ ক’খানা গ্রন্থ রচনা করেন। তার লিখিত নাটক ছিল সমাজের দর্পনতূল্য।

মনোজ বসু

  

বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মনোজ বসু। ১৯০১ সালের ২৫ জুলাই যশোরজেলার কেশবপুর থানার ডোঙ্গাঘাটা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। আমি সম্রাট, নিশিকুটম্ব, নবীন যাত্রা, কিংশুক, মায়াকান্না ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্যগ্রন্থ।

এ্যাডভোকেট শহীদ মশিউর রহমান

চৌগাছা থানার সিংহঝুলি গ্রামে ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালে ২৩ এপ্রিল শহীদ হন।

শহীদ মোঃ মশিউর রহমান যশোর তথা বাংলাদেশের একটি পরিচিত নাম। দেশের স্মরণীয় ও বরণীয় একজন। আধুনিক মনন ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় একজন নিবেদিত সাহসী নেতার নাম। ১৯৩৬ সালে যশোর জেলা স্কুল হতে এন্ট্রান্স, ১৯৩৮ সালে কলকাতা ইসলামীয়া কলেজ হতে আইএ এবং ১৯৪০ সালে বিএ পাশ করে ১৯৪৪ সালে কলকাতা লর্ড রিপন কলেজ হতে ল‘ ডিগ্রী অর্জন করেন। উপমহাদেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ব্যারিষ্টার হোসেন শহীদ সোরওয়ার্দির সংস্পর্শে আসেন এবং একান্ত বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৪৯ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি যশোর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে সাবেক পাকিস্তানের শেষ নির্বাচনে জনাব মশিউর রহমান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে তিনি যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে সাবেক পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং শেরে বাংলা ফজলুল হকের মন্ত্রীসভায় বিচার ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পাকিস্তান সরকার ১৯৭১ সালে তাঁকে নিয়ে সংকিত ছিলেন। তাই ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর সাথে তাঁকেও ঐ রাতে গ্রেফতার করে এবং যশোর সেনানিবাসে একমাস আটক রেখে পৈশাচিক নির্যাতন চলে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যশোর পৌর উদ্যানে ১৯৭২ সালের ২৬ ডিসেম্বর শহীদ মশিউর রহমানের স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচন করেন।

যতীন্দ্রনাথ মূখোপাধ্যয় (বাঘা যতীন,

১৮৭৯ সালে কুষ্টিয়া জেলার কয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯১৫ সালে ১০ সেপ্টেম্বর মারা যান।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে (স্বরাজ থেকে স্বাধীনতা) যে ক’জন অসীম সাহসী বিপ্লবী জড়িত ছিলেন, যতীন্দ্রনাথ মূখোপাধ্যায় তাঁদের অন্যতম। ডাকনাম বাঘা যতীন। রাখেন ডাঃ সুরেষ প্রসাদ রায়। বাঘ শিকারে যান, বাঘকে গুলি করলে ক্ষিপ্ত বাঘ লাফ দিয়ে যতীন্দ্রনাথ মূখোপাধ্যয়ের ঘাড়ে এসে পড়ে। তিনি বাঘকে কাবু করে ছোরা দিয়ে হত্যা করেন। ঘটনা শুনে ডাক্তার সাহেব প্রেসকিপসনে নাম লেখেন বাঘা যতীন। দীর্ঘ ও সুঠাম দেহের অধিকারী যতীন্দ্রনাথ মূখোপাধ্যয় বাইরের চেয়ে ভিতরে ছিলেন কঠিন, কঠোর ও অকুতোভয়। উপমহাদেশের বিপ্লবী খাতায় তার নাম পরিচিতি পায়।

প্রফেসর শরীফ হোসেন

১৯৩৪ সালের ০১ জানুয়ারী যশোর শহরস্থ খড়কী পীর বংশে জন্মগ্রহণ করেন।

২০০৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। যশোর জেলা স্কুল হতে মেট্রিকুলেশন ও এম এম কলেজ হতে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ১ম বিভাগে উত্তীর্ন হন। অথচ তিনি ছিলেন মাত্র ২ বছর বয়সে পিতৃহারা। তিনি ছিলেন সমাজ সচেতন। কিশোর কাল হতেই ছাত্র সংগঠন ও একাধিক রাজনৈতিক দলের সংগঠকও একনিষ্ঠ কর্মী হয়েও জন স্বার্থের প্রশ্নে কখনও নতি স্বীকার করেননি। রাজনীতির কারণে একাধিকবার জেল খেটেছেন। যশোর ইন্সটিটিউটের আধুনিকায়নে শরীফের মেধা জনপদের অনেকের চেয়ে বেশী। অধ্যাপক শরীফ হোসেন সমাজ কর্মে আমাদের অনুপ্রেরণা। বাঁচার ইঙ্গিত। ভাগ্যহীনদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলের অভিভাবক। ১৯৭৪ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত এতিমখানা, ১৯৮৭ সালে দরিদ্র ছাত্রদের লিল্লাহ-ট্রাস্ট ও ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বহুমুখী সমাজ কল্যাণ সংস্থা সন্দীপন অনন্য উদাহরণ। তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারের কাছ থেকে সম্মাননা পেয়েছেন।

১০

সংগ্রামী মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

১৯১৬সালে মল্লিকপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৯৭মৃত্যুবরণ করেন।

সংগ্রামী জনাব মোঃ বেলায়েত হোসেন অবিভক্ত বাংলায় তৎকালীন যশোর জেলায় মুসলমানদের অগ্রযাত্রা সবিশেষ অবদান রাখেন। ১৯২৯ সালে রায়গ্রাম স্কুল ত্যাগ করে যশোর সম্মিলনী হাইস্কুলে ভর্তি হন। যশোরে মুসলমানদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা দেখে, অবস্থার উত্তরণে তিনি কৃত-সংকল্প হলেন। কিশোর বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন মুসলিম লাইব্রেরী। মুসলমানদের অগ্রযাত্রা ও উন্নতিতে জনাব হোসেন ছিলেন সবার আগে। সে সময় স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে তিনি ছিলেন সুপরিচিত।

১১

বেগম আয়েশা সরদার (নারী আন্দোলনের নেত্রী)

১৯২৭সালে বাঘারপাড়ার খানপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৮৮ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী ইন্তেকাল করেন।

দেশের মহিলাংগণে একটি পরিচিত নাম। নারী আন্দোলনের একজন সফল নেত্রী। ১৯৪২ সালে তিনি যশোর নারী-শিল্প আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৬ ও ১৯৬৮ সালে তিনি দু’বার চিন সফর করেন। ১৯৬৪ সালে এম,পি,এ নির্বাচিত হন। তিনি অনেক সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। যশোর মহিলা কলেজ, কেশবপুর বালিকা বিদ্যালয়, এস এস ঘোপ প্রাথমিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, যশোর নিউ টাউন বালিকা বিদ্যালয়, হুদো প্রাইমারী ও জুনিয়র হাইস্কুল, নারিকেলবাড়ীয়া বালিকা বিদ্যালয় এবং এনায়েতপুর মাদ্রাসা তাঁর মধ্যে কয়েকটি।

১৯৫৩ সালে তিনি সাহিত্য-ভূষণ খেতাব ও করোনেশান মেডেল লাভ করেন। এবং ১৯৬৭ সালে পাক-প্রেসিডেন্ট কর্তৃক তমঘা-ই-খেদমত খেতাব লাভ করেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারিণী বেগম আয়েশা সরদার যশোর তথা বাংলাদেশের মহিলা সমাজের অহংকার।

১২

শিক্ষাবিদ আব্দুর রউফ

১৯০২ সালের ২ ডিসেম্বর ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার নারায়নপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। (১৯০২-১৯৭১)

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল পাক সেনারা গুলি করে হত্যা করে।

১৯১৯ সালে কলিকাতা হতে তিনি প্রথম বিভাগে এন্ট্রাস পাশ করেন। তিনি কৃতিত্বের সাথে আই,এ বি, এ এবং বি,টি পাশ করেন। কলিকাতা ক্যাম্বেল মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যায়ন কালে এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার প্রতি বিশ্বাস হারাইয়া শেষবর্ষে তিনি কলেজ ত্যাগ করে ইউনিপ্যাথি চিকিৎসা নামে এক আদর্শ চিকিৎসা ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেন। শিক্ষা-জীবন শেষকালে তিনি কলিকাতা মডেল হাইস্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। তাঁর লিখিত বইগুলির অধিকাংশই এই সময়ের। বইগুলির মধ্যে আছে পথের ডাকে, অগ্র-সেতার, যুগের ডাক, স্বাধীনতার পথ, দি কাল অব দি ডে, তিন জাতের মেয়ে। দি হ্যাপিয়ার হিউম্যানিটি মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত তাঁর হাতে ছিল। তিনি পাকিস্তান লেখক সংঘের আজীবন সদস্য ছিলেন। তিনি কর্মজীবনে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন এবং ১৯৫৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

১৩

ওয়াহেদ আলী আনসারী

১৯০৯ সালে ১৫ জানুয়ারী চৌগাছার জগন্নাথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৯১ সালে ২২ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন।

হাতে টাকা নেই ‘‘আমাকে আজকেই রোজগার করতে হবে।’’ এই প্রকৃতির দৃঢ় মনোবলের অধিকারী জনাব আনসারী ১৯৩০ সালে কোটচাঁদপুর স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন। তিনি স্বদেশী আন্দোলনে অন্যতম ভূমিকা রাখেন। সাংবাদিকতায় বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন। যশোর গেজেট প্রত্রিকার প্রকাশক, মুসলিম একাডেমী ও যশোর হোমিওপ্যাথিক কলেজ ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা। বেশ ক’খানা গ্রন্থের পাশাপাশি কাব্য-কোরাণ তাঁর সাহিত্য সাধনার স্মারক চিহৃ।

১৪

মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান

১৯৩৬ সালের১৫ই আগষ্ট যশোর শহরের পশ্চিম প্রান্তে খড়কি গ্রামে জম্ম গ্রহন করেন।

 

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নন্দিতগবেষক ও আধুনিক বাংলা কাব্যের উজ্জ্বলতম ব্যক্তিত্ব প্রাবন্ধিক অর্নিবাণ, নির্বাচিত গান তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

১৫

ধীরাজ ভট্রাচার্য

১৯০৫ সালের কেশবপুর উপজেলার পাঁজিয়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।

 

বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্র জগতের অজস্র অনুরাগীরঅন্তরলোকে যাঁর ভাবমূর্তি চিরলাবন্য ও মহিমায় বিরাজমান তিনি ধীরাজভট্রাচার্য। যখন আমি পুলিশ ছিলাম ও যখন আমি নায়ক ছিলাম-২টি তাঁর উল্লেখ্যযোগ্য গ্রন্থ।

১৬

আনোয়ারা সৈয়দা হক

১৯৪৩ সালে ৫ নভেম্বর যশোর শহরের চুড়িপট্রিতে জন্মগ্রহণ করেন।

 

বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক আনোয়ারা সৈয়দা হক এঁর রচনাবলীর মধ্যে অন্যতম হলতৃষিতা, সোনার হরিণ, তৃপ্তি, হাতছানি, মুক্তিযোদ্ধার মা, ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্যগ্রন্থ।

১৭

কে পি বসু (কালিপদ বসু,

১৮৬৫ সালে ঝিনাইদহ জেলার হরিশংকরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯১৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

উপমহাদেশের খ্যাতিমান এ্যালজেবরিয়ান কালীপদ বসু এন্ট্রান্স পাশ করে কলিকাতা লর্ড রিপন কলেজে ভর্তি হন। ১৮৮২ সালে তিনি হান্টার কমিশনের দেয়া দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে ছাত্রদের এ্যালজেব্রা অনুশীলনের পথ সহজতর করে দেন। ১৮৯২ সালে তিনি ঢাকা কলেজে গণিত শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং আমৃত্যু কর্মরত ছিলেন। তিনি ইতিহাসে অমর।

১৮

আলোকচিত্রকর মোঃ সফি

  

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও পরবর্তীকালের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলীর দালিলিক সাক্ষী। তিনি একজন দেশপ্রেমিক ও দক্ষ আলোকচিত্রকর এবং যশোরে আমজনতার কাছে আলোকচিত্রকর হিসেবে সুপরিচিত। জেলার খ্যাত স্টুডিও ফটোফোকাসের স্বত্ত্বাধিকারী। তিনি স্বযত্নে ও দক্ষভাবে অনেক স্বাধীনতার অনেক মুল্যবান চিত্র ক্যামেরাবন্দি করে রেখেছিলেন।

 

তথ্য সূত্রঃ

১। যশোরের ইতিহাস- মনোরঞ্জণ বিশ্বাস (প্রকাশকাল-১৬ ডিসেম্বর ২০০৯)

২। যশোর জেলার ইতিহাস-আসাদুজ্জামান আসাদ