অপরাধ বিচারিক প্রশাসন (১৭৮১-৯০)

অপরাধ বিচারিক প্রশাসন (১৭৮১-৯০)

ম্যাজিস্ট্রেটদের অপরাধের কোন বিচারিক ক্ষমতা ছিল না। তারা শুধু তাদের অধ:সত্মন পুলিশের নিকট হতে কেস গ্রহণ করতে পারতেন এবং অপরাধ আমলে নিয়ে যদি যথাযথ মনে করতেন তাহলে বিচারের জন্য দারোগার কাছে পাঠাতে পারতেন। দারোগা ছিলেন নিজামের অধীনে কর্মরত একজন কর্মকর্তা।

ছোট মামলা পরিচালনার জন্য মাজিস্ট্রেট কে ক্ষমতা প্রদান

১৭৮৫ সালে সরকার ম্যাজিস্ট্রেটকে ক্ষমতা প্রদান করলো ছোট মামলা যেমন শারিরিক আক্রমণ, অপব্যবহার, চুরি, এগুলোর শুনানী গ্রহণ শেষে চার দিন ও ১৫ দোররার বেশি নয় এমন শাসিত্ম আরোপ করতে পারবেন। এর বাইরে ম্যাজিস্টেট দারোগার কতৃত্বে কোনরূপ হসত্মক্ষক্ষপ করতে পারতেন না।৮৯

প্রচুর সময়ক্ষক্ষপন 

মামলার শুনানীতে প্রচুর সময়ক্ষক্ষপণ হতো। ১৭৯০ সালের একটি বিবরণীতে পাওয়া যায় যে, আসামীকে দারোগার কাছে হসত্মামত্মরের পূর্বে শুনানীর জন্য গড়ে প্রায় ১ মাস সময় লাগত। আসামীদের নিকট হতে সাফাই সাক্ষী নেয়া হত, যদি প্রমাণাদি দ্রম্নত উপস্থাপন করা হতো তাহলে ৮ থেকে ১০ মাসের মধ্যে রায় প্রদান করা যেত। কিন্তু যেখানে এরকম সরলীকরণ নেই সেখানে দোষীকে ৪ থেকে ৬ বছর বিচারের আওতাধীন থাকতে হতো। এই ব্যবস্থার ফলে যাদের বিচার করা হচ্ছে বা যারা নিজামের কাছ থেকে শাসিত্মর জন্য অপেক্ষা করছে তারা প্রায়শই জামিনে বের হয়ে যেত, এমনকি খুনি ও দস্যুদের সাথেও এই একই আচরণ করা হত।

এই অস্বাভাবিক কালক্ষক্ষপণের ফলে কাজ সম্পাদনের মাত্রা ছিল খুবই কম। সারাদিনে ম্যাজিস্ট্রেট ও দারোগার মধ্যে শুধু একটি মামলা সম্পাদিত হতো। এই দীর্ঘসূত্রীতার মূল কারণ ছিল এই বাংলার সকল মামলাই রায়ের জন্য নায়েবে নিজামের কাছে প্রেরিত হতো, এর কোন মামলাই ঘটনাস্থলে মিমাংসার সুযোগ ছিল না। ৯০

নম্র ও ভদ্র গুণাবলী

দারোগার কোর্টের বিচারকদের গুণাগুণ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। দারোগাদের বিচারিক ক্ষক্ষত্রে নম্র ও ভদ্র স্বভাবের মনে হতো যখন তারা খুন কিংবা দস্যুতার অভিযোগের শাসিত্ম হিসেবে ছোট শাসিত্ম প্রদান করতেন। এক্ষত্রে ম্যাজিস্ট্রেট কে পরামর্শ প্রদান করা হতো তারা যেন ঐ মামলাটি ভালোভাবে পরিচালনার জন্য দারোগার আদালতে হসত্মামত্মর করেন। ১৭৯১ সালের এপ্রিল মাসে কিছু খুন ও দস্যুতার কেস ছিলো যা ৩৯ বেত্রাঘাত অথবা ৪ মাসের জেল অথবা ১ বছরের কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছিল।৯১

শাসিত্মসমূহ

যে শাসিত্মগুলো সচারাচর দেয়া হত তা হলোঃ মৃত্যুদন্ড, কারাদন্ড, বেত্রাঘাত ও অঙ্গহানী। কারাদন্ড সাধারণত যাবজ্জীবন করাদন্ড হত। তবে আদেশে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের মেয়াদ উলে­খ থাকত না। এ বিষয়টা ছিল সরকারের মর্জির উপর নির্ভরশীল। তাছাড়া আসামী  যদি ক্ষতিপূরণ প্রদান করতেন বা ভাল আচরণ করতেন তাহলে  এই বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে তার শাসিত্মর মেয়াদ নির্ধারন করা হতো। ১৭৯২ সালে যখন বৃটিশ সরকার জেলের দায়িত্ব বুঝে নিল তখন যশোর জেলে ৩০০ জন আসামী ছিল। এর মধ্যে ১০৮টি মামলা ছিল যাদের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ কোন নির্দিষ্ট মেয়াদের উলে­খ ছিল না। এর মধ্যে কিছু কেস ছিল হত্যা কিন্তু বেশিরভাগ কেস ছিল দস্যুতার এবং একটি কেস ছিল শারীরিক আক্রমণের।

মামলা পরিচালনার একটি অদ্ভুত উদাহরণ এখানে উলে­খযোগ্য। এক ব্যক্তিকে আটক করা হলো এবং তার সম্পত্তিও ক্রোক করা হলো। বলা হলো যদি সে শেষ পর্যমত্ম দোষী সাব্যসত্ম হয় তাহলে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। যদি তাকে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে তার সম্পত্তিও তাকে ফিরিয়ে দেয়া হবে। ফৌজদারী কোর্টের এই বিচারিক ব্যবস্থাটা ছিল খুবই অযৌক্তিক। কারণ একই সাথে কোন ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে, আবার ঐ ব্যক্তিকেই বলা হচ্ছে তার অপরাধের ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য, যা তাকে ঐ সম্পত্তি থেকেই আয় করে প্রদান করতে হবে জেলে আটক থাকা অবস্থায়। কার্যত যা ছিল একেবারেই অসম্ভব।৯২

দোষীদের প্রতি আচরণ 

জেল দারোগার অধীন ছিল, ম্যাজিস্ট্রেটের নয়। জে ওয়েস্টল্যান্ডের মতে কয়েদীদের সাথে আচরণের বিষয়টি মুসলমান সরকারদের কাছে কখনোই গুরম্নত্ব পায়নি। এই কারণে ম্যাজিস্ট্রেটগণ সবসময়ই শাসিত্মপ্রদানের যে উপায়গুলো গ্রহণ করেছিলেন তা ছিল অপ্রতুল। কয়েদীদের মধ্যে নিয়মশৃংখলা এতই কম ছিল যে, তাদের খুব কম সংখ্যককেই বহিরাগতদের সাথে যৌন মিলন থেকে বিরত রাখা যেত। তারা ছিল একেবারে অলস, এবং কিছু কিছু ক্ষক্ষত্রে তাদের বাজার করতে বাইরে যেতে দেয়া হত। তাই জেলের শৃংখলা তাদের কাছে খুব একটা বড় অপ্রতিরোধ্য বাঁধা ছিল না। ‘অঙ্গহানি’ শাসিত্মটিকে অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকরী শাসিত্ম হিসেবে মনে হলেও তা অপরাধ দমনে তত কার্যকরী ছিলনা। ম্যাজিস্ট্রেটের মতে দুই একবার অঙ্গহানি ঘটেছে এমন আসামী অন্য অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে প্রায়শই পুনরায় বিচারের সম্মুখীন হতেন। এমনকি মৃত্যুদন্ড অদৃষ্টবাদী কয়েদিদের মনে কদাচিৎ ভয় ধরাতে পারত।

১৭৮২ সালের একদম শুরম্নর দিকে জনাব হেঙ্কেল এ বিষয়টি ভেবেছিলেন যে কুখ্যাত অপরাধীদের সমুদ্রে পাঠাতে হবে কারণ অনেক জাহাজের ক্যাপ্টেনই নেটিভ জাহাজি খুঁজে বেড়ান কিন্তু পাননা। কয়েদীদের সমুদ্রে পাঠালে তারা তাদের বর্ণ হারাবে এবং এটা শাসিত্মর ক্ষক্ষত্রে একটা নতুন মাত্রা যোগ করবে। আর সাধারণ কয়েদীদের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়ে গণপূর্তের কাজে লাগানো যেতে পারে।জনাব হেঙ্কেল আসামী কলোনীর প্রসত্মাবনা করেছিলেন। যদিও ঐ প্রসত্মাবের কোন ফল আসেনি। পরে তিনি আরেকটি প্রসত্মাব করেন, যেটা পরপর্তীতে ‘সুন্দরবন পরিকল্পনা’ নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। এটা এমন একটা পরিকল্পনা যেখানে জমিদার ও তালুকদারকে কিছু টাকা প্রদান করে সুন্দরবনের কিছু অংশ পুনরম্নদ্ধার করার কথা বলা হয়েছিল। সেখানে নৃশংস কয়েদী বাদে বাকি সবার নামে জমি বরাদ্দ প্রদান করা হবে যেন তারা কলোনি স্থাপন করে বসবাস করতে পারে। জনাব হেঙ্কেল তার একটা মতামতে স্থির ছিলেন যে, কয়েদীদের দেশের মূল ভূখন্ড থেকে দূরে কোথাও নিয়ে ফেলতে হবে।

তৎকালীন সময় রাজস্ব বোর্ড অপরাধ ও অপরাধাদের বিষয়েও কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করত। রাজস্ব বোর্ড হেঙ্কেলের এই পরিকল্পনাকে অনুমোদন প্রদান করেছিলেন। জনাব হেঙ্কেল সকল জেলার কাছে আবেদন করেছিলেন তারা যেন দীর্ঘমেয়াদে শাসিত্ম প্রাপ্ত কয়েদীদের তার কাছে পাঠিয়ে দেয় যেন কয়েদী কলোনি নির্মানের কাজ শুরম্ন হতে পারে। কিন্তু কয়েদীদের প্রেরণের কার্যক্রম ছিলো অত্যমত্ম ধীর গতি সম্পন্ন।৯৩

স্থানামত্মর ও জবরদসিত্ম শ্রমের প্রসত্মাবনা

জনাব হেঙ্কেল পরবর্তীতে কয়েদীদের প্রতি আচরণ বিষয়ে আরো একটি প্রসত্মাবনা দিয়েছিলেন। এটা ছিল এমন যে দীর্ঘমেয়াদি কয়েদীদের স্থনামত্মর করতে হবে এবং যারা স্বল্পমেয়াদের জন্য আছে তাদের রাসত্মার কাজে নিয়োগ করতে হবে। এই প্রসত্মাবটি গভর্ণর জেনারেল স্বয়ং অনুমোদন দিলেন, এবং নায়েবে নাজিমকে এটা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করেছিলেন। কয়েদীদের রাসত্মার পাশে কাজ করার বিষয়টি মুসলিমদের হাত থেকে বৃটিশদের হাতে অপরাধ প্রশাসন হস্থামত্মর হওয়ামাত্র কার্যকর হয়েছিল।৯৪

১৯৬৭ সালের অপরাধ বিচার প্রশাসন

অপরাধ বিচার প্রশাসন ১৯৬৭ সালে ১ জন সেশন জজ, ১ জন অতিরিক্ত সেশন জজ, ২ জন সহকারী সেশন জজ এবং ২ জন স্টাইপেন্ডিয়ারী ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা ফৌজদারী আদালত পরিচালিত হত। ১৯৬৭ সালে স্টাইপেন্ডিয়ারী ম্যাজিস্ট্রেটগণ ১৩,৫৯৬টি মামলার মধ্যে ৬,০৬৮টি মামলা নিষ্পত্তি করেছিলেন।৯৫