যশোর কালেক্টরের দায়িত্ব ও কর্তব্য

যশোর কালেক্টরের দায়িত্ব ও কর্তব্য

তৎকালীণ কালেক্টরের কর্তব্য শুধুমাত্র ভূমি রাজস্ব সংগ্রহের সাথে সম্পর্কিত ছিল। তাকে প্রতিবছর তার কালেক্টরের অধীন স্টেটগুলোতে রাজস্ব সংগ্রহের বিষয়টি বন্দোবসত্ম প্রদান করতে হতো। তার ছিল নামমাত্র বিচারিক ক্ষমতা যেমন- খাজনা সংক্রামত্ম বিরোধ মিমাংসা এবং জমিদার ও রায়তের মধ্যে জমির বণ্টন মিমাংসা।

ভূমি রাজস্ব সংগ্রহ

তৎকালীন সময়ে রাজস্ব সংগ্রহের বিষয়টি আভ্যমত্মরীণ প্রশাসনের অন্যান্য বিষয় থেকে স্বতন্ত্র ছিল। প্রথম জেলা অফিসার এসেছিল সরকারকে পরিচালনার জন্য, রাজস্ব সংগ্রহের জন্য নয়। অনেক বছর যাবত জেলা রাজস্ব (কোলকাতার এবং রাজশাহী জেলার কিছু অংশসহ) জেলার একজন অফিসারের পরিচালনায় সংগ্রহিত হত।

১৭৭২ থেকে ১৭৭৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে যশোর জেলায় মাত্র এক বা দুই বছরের জন্য একজন কালেক্টর নিয়োগ লাভ করেছিলেন। এটা ছিল একটা পরীক্ষামূলক পদ্ধতি যা ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার অনেক জেলায় চালু করেছিলেন। কিছুদিন পর তিনি আবার বাড়তি খরচের কারণে এই পদ্ধতি বিলোপ করে দিয়েছিলেন। এটা ছিল সরাসরি রাজস্ব সংগ্রহের কম খরচের ও কম দক্ষতা সম্পন্ন প্রথম পদক্ষক্ষপ। কিন্তু এ বিষয়ে ওয়েস্টল্যান্ড বলেন যে, যদি ইংরেজ কালেক্টরেরা ১৭৭২ থেকে ১৭৭৪ সালে মধ্যবর্তী সময়ের পরেও তাদের কর্মস্থলে নিয়োগপ্রাপ্ত থাকতেন, তাহলে বৃটিশ সরকারের চোখ খুলে যেত। তারা দেখতে পেতেন কি দানবীয় অবিচার করেছে জমিদাররা নেটিভদের উপর। তাহলে বৃটিশরা দেশের আভ্যমত্মরীণ প্রশাসন ব্যবস্থায় ১৭৮১ সালের বহু পূর্বেই সরাসরি অংশগ্রহণ করতে বাধ্য হতেন। তাই এটা ভালোভাবে বোঝা যায় যে সরাসরি সরকার ব্যবস্থা ১৭৭২ সালেই চালু হয়ে গিয়েছিলো। তবে ১৭৮১ সালের পূর্বে বৃটিশরা যা করেছে তাকে কোনভাবেই আভ্যমত্মরীণ প্রশাসন নামে অভিহিত করা যায় না। সারা বাংলার বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে অর্ধ ডজনের মত দেওয়ানী আদালত পরিচালনা করাকে কোনক্রমেই সক্রিয় সরকার ব্যবস্থা বলা যায় না।

সমসত্ম জেলার জমি বাংলা ১১৭৮ সালে (১৭৭২) সালে রাজস্ব কমিটির দ্বারা বন্দোবসত্ম প্রদান করা হয়। স্থানীয়ভাবে তদমত্ম করে জমিদারদের সম্পত্তির আসল হিসাব বের করে আনার জন্য রাজস্ব কমিটি জনাব লেনকে নিয়োগ করেন। এই বন্দোবসত্ম কার্যক্রম সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হতো বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে। বাৎসরিক যাচাই কাজ পরিচালনার জন্য কালেক্টর কোন নীতিমালা সংক্রামত্ম বিসত্মারিত তথ্যাদি আমলে নেয়ার সময় পেতেন না। প্রাথমিকভাবে একটা খসড়া হিসাব প্রস্ত্তত করা হত এবং তার ভিত্তিতে কালেক্টর জমিদারদের কাছ থেকে খাজনা নিতেন। যদি কালেক্টর ও জমিদার ঐক্যমতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হতেন তাহলে কালেক্টর জমিদারকে বাদ দিয়েই সরাসরি ভূমি থেকে তার পূর্ব নির্ধারিত খসড়া তালিকা অনুযায়ী রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারতেন। প্রতি বছর এই বন্দোবসত্ম প্রদানের কাজ ভাদ্র ও আশ্বিস মাস আসার পূর্ব পর্যমত্ম সমাপ্ত হত না।

রাজস্ব আদায়ের জন্য কালেক্টর অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগের ক্ষমতা রাখতেন। রাজস্ব খেলাপীদের বিরম্নদ্ধে এমনকি তাদের যুক্তিসংগত দাবী থাকলেও কালেক্টর ইচ্ছে করলে তাদের বিরম্নদ্ধে অনেক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতেন। খেলাপীদের বিরম্নদ্ধে  জেলের ব্যবস্থা ছিল যেখানে তিনি তাদের আটক রাখতে পারতেন। কালেক্টর যে কোন স্টেটের খাজনার বিষয়ে সম্পৃক্ত হতে পারতেন। এই সম্পৃক্ততা প্রাথমিকভাবে একটা বড় হুমকির কারণ মনে হতে পারে; কিন্তু রায়তের উপর কালেক্টরের খাজনার চাহিদা জমিদারদের থেকে অনেক কম ছিল। দেনা পরিশোধের জন্য জমিদারদের জমিদারি বিক্রয় করে দেয়ার বিষয়টি তখন চিমত্মাই করা যেত না। কিন্তু তত্ত্বগতভাবে এর দৃষ্টামত্ম পাওয়া যায় যেখানে জমিদারদের জমি বিক্রয় করে দেয়ার ক্ষমতা ছিল। আসলে জমিদাররা ছিলেন কোম্পানীর অধীন শুধুমাত্র রায়তদের কাছ থেকে রাজস্ব সংগ্রহের ঠিকাদার; যেখানে রাজস্ব ছিল শুধুমাত্র সরকারের সম্পত্তি।৫৮ট্রেজারী

কালেক্টর ট্রেজারীর দায়িত্বে নিযুক্ত থাকতেন। তাকে কোলকাতায় মাসিক রেমিটেন্স পাঠাতে হতো। শুধুমাত্র কালেক্টরেটের জন্য নির্দিষ্ট মাসিক ভাতা, স্থাপনার ব্যয় নির্বাহের বিল ও বরাদ্দকৃত অর্থের আনুষাঙ্গিক বিল ছাড়া আর সবই তাকে নগদ অর্থে প্রেরণ করা হত। খরচের বিষয় কালেক্টর খুবই নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হতেন। তাকে মাঝে মাঝে কিছু দরকারী ও আইনসিদ্ধ খরচও রিফান্ড করতে বলা হত। তৎকালীন রেকর্ড ঘেটে জানা যায় যে সময়মত খরচের হিসাব না পাঠানোর জন্য কালেক্টরকে একবার তিনশত রম্নপি জরিমানা করা হয়েছিলো।৫৯

 

ঋণখেলাপীদের সম্পদ বিক্রয়

ভূমি রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি কালেক্টরের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল ঋণখেলাপীদের সম্পদ বিক্রয়। ১৭৭২ সালের ১৯শে নভেম্বর যশোরে প্রথম ঋণখেলাপীদের সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে রাজস্ব আদায় শুরম্ন হয়। ঐ সময়ে জমিদাররা এই সম্পত্তি বিক্রয়ের ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন। তারা কালেক্টর কর্তৃক নিয়োগকৃত আমিনদের ঐ সমসত্ম ভূমি থেকে তুলে নিতে বলেন এবং যারা ঐ সম্পত্তি ক্রয় করেছে তাদের ঐ সম্পত্তি দখল নিতে বাধা প্রদান করেন। মূলত জমিদাররা চাচ্ছিলেন না যে তাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে জমি-জমা অন্যের হাতে চলে যাক। দেওয়ানী আদালতে সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষক্ষত্রে বোর্ডের একটা নির্দিষ্ট ক্ষমতা ছিল। রাজস্ব বোর্ডের অনুমতি ছাড়া কোন সম্পত্তি বিক্রয় করা যেত না। এমনকি বেসরকারীভাবে জমি বিক্রির ক্ষক্ষত্রেও অনুমতির প্রয়োজন ছিল। জমিদাররা যদি জমি বিক্রি করত সেক্ষক্ষত্রে সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করতে হত নতুবা বিক্রি বাতিল হত।৬০

বিক্রয়কৃত সম্পত্তির বিবরণী প্রস্ত্তত

১৮০২ সাল থেকে কালেক্টর বিক্রয়কৃত সম্পত্তির টাকার হিসাব বিবরণী প্রস্ত্তত করা শুরম্ন করলেন। কোলকাতাসহ বড় বড় রাজ্যে এই হিসাব বিবরণী প্রস্ত্ততের পর দেখা গেল রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ পূর্বের চেয়ে অনেক বেশী হয়েছিল। কালেক্টরগণ সরকারী সম্পদেরও রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। কোর্ট যে সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ করত কালেক্টর তাও দেখাভাল করতেন।৬১

রাজ্য বিভাজন

কালেক্টরগণের কাজের তালিকা ছিল অনেক বড়। তাদের কাজের মধ্যে অন্যতম হল-রাজ্যের বিভিন্ন অংশের বিক্রিত সম্পত্তির মূল্যের হিসাব করা এবং তালুকসমূহ ভাগ করা। রাজ্যকে বিভাজন করাও কালেক্টরের কাজ ছিল। রাজ্যের সীমারেখার বিভাজন তখন আইনসিদ্ধ ছিল যেন ভূমি থেকে বেশী পরিমানে লভ্যাংশ পাওয়া যায়। প্রথম মুহাম্মদশাহীর বিভাজন করা হয়েছিল। এ বিভাজন করতে মাত্র দুই বছর সময়লেগেছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় নিয়ে রাজ্য বিভাজন হয়েছে এমন উদাহরণও আছে। এখানে নাওয়ারা নামে একটা রাজ্যের কথা উল্লেখ করা যায়। এ রাজ্যের বিভাজন  করতে ১৮০১ থেকে ১৮০৮ সাল পর্যন্তু সময় লেগেছিল। বিরোধী পক্ষক্ষর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে ঝামেলার কারণে রাজ্য বিভাজন করতে এত বেশি সময় লাগত।৬২
শুল্ক আদায়

শুল্ক আদায়ের মাধ্যমে রাজস্ব অর্জন ছিল কালেক্টরের অন্যতম একটা কাজ। বাঁধ নির্মাণ করে জনবসতি রক্ষা করার মত উল্লেখযোগ্য কাজও কালেক্টরের কাজের তালিকায় ছিল। কালেক্টর রাজকোষ থেকে পাঠানো টাকা সংগ্রহ করতেন এবং বিভিন্ন দুর্যোগের সময় দুর্যোগ মোকাবেলায় অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন।৬৩

স্ট্যাম্প বিক্রয়

স্ট্যাম্প নিয়েও কালেক্টরগণ কাজ করতেন। তৎকালীন সময় স্ট্যাম্পের চাহিদাপত্র দেখে স্ট্যাম্প বিক্রির পরিমাণ জানা যায়। কালেক্টর কর্তৃক নিয়োগকৃত এজেন্ট দ্বারা এই স্ট্যাম্প বিক্রি করা হতো। বিক্রি করা টাকা জেলার বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে জমা করা হতো। ১৮১৪ সালে থানাগুলোতে ৮টি স্ট্যাম্প ভেন্ডার ছিল। কালেক্টর তার বেতনের সাথে স্ট্যাম্প বিক্রির জন্য একটা নির্দিষ্ট হারে কমিশন পেতেন।

১৮১৩ সালে স্ট্যাম্প সংগ্রহশালার একটা বৃহৎ দলিল পাওয়া যায়। একটা ঘটনায় জানা যায় স্ট্যাম্প সংগ্রহশালার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এক ব্যক্তি সরকারী স্ট্যাম্প বাদে নিজের তৈরীকৃত স্ট্যাম্প বিক্রি করতেন। এর মাধ্যমে তার প্রচুর টাকা আয় হত। পরবর্তীতে দেওয়ানী আদালত ডুপ্লিকেট স্ট্যাম্পের ব্যাপারে একটা দলিল প্রস্ত্তত করে যাতে ঐ জাল স্ট্যাম্প তৈরীর বিষয়টি বের হয়ে আসে। পরবর্তীতে ভুয়া স্ট্যাম্প তৈরীর জন্য সংগ্রহশালার প্রধানের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয় এবং তাকে অনৈতিক কার্যকলাপের দায়ে দোষী সাব্যসত্ম করে আটক করা হয়।৬৪

উৎসবের আয়োজন

প্রত্যেক জমিদারিতে বাৎসরিক পুণ্যাহ উৎসব ছিল। জমিদার-কাচারীতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করার জন্য কিছু খরচ করার একটা রীতি প্রচলিত ছিল। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন বছরের জন্য টাকা আদায়ের উদ্বোধন করা হতো। এই আয়োজনের পূর্বে কোন টাকা আদায় করা হতো না এবং এ অনুষ্ঠান ছিল টাকা আদায়ের একটা বিজ্ঞাপন। মি. হেঙ্কেল তার শাসনামলে একটি পুন্যাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। মুড়লীতে টাকা আদায়ের তারিখ হিসেবে পুন্যাহের ঐ দিনকে ঘোষণা করেন। ১৭৯০ সালে কালেক্টর পুণ্যাহ অনুষ্ঠানে যে খরচ করেছিলেন তার একটা তালিকা পাওয়া যায়। ঐ তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, আগুন প্রজ্বলন কাজে ৬৫ রম্নপি, টম-টমের জন্য ৭ রম্নপি, বালিকাদের নাচের জন্য ৩৫ রম্নপি, বালকদের নাচেরজন্য ১৫ রম্নপি খরচ হয়েছিল। সরকার এই খরচের স্বীকৃতি দেন নি কারণ এ ধরণের খরচ আগে কখনও হয়নি। কিন্তু রাজস্ব বোর্ড এবং কালেক্টরের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। এই কারণে কালেক্টর সম্ভবত অনুষ্ঠানের ব্যয় কম দেখাতেন।৬৫

কালেক্টরের বাৎসরিক ভ্রমণ

১৭৮৯ সালে বোর্ডের আদেশ অনুযায়ী কালেক্টরগণ বাৎসরিক ভ্রমণে গেলেন। বোর্ড তাদের ভ্রমণের ব্যাপারে নিয়মিত কোন সিদ্ধামত্ম দেয়নি। কয়েকজন কালেক্টর বাৎসরিক ভ্রমণে যেতেন এবং কয়েকজন যেতেন না।৬৬